আহারে প্রবাস, স্বপ্ন পূরণের আগেই ফিরতে হচ্ছে লা’শ হয়ে !

290

প্রবাস জীবন কখনোই সুখকর হয় না। তবু মানুষ প্রবাসী হয়। পরিবারের মানুষগুলোকে একটু ভালো রাখার আশায়, এদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব নিয়ে এরা পাড়ি জমায় প্রবাস নামের যন্ত্রণায়। নানামুখী কারণে প্রবাসী হওয়া এসকল মানুষগুলোর কাঁধে একটি নয় দু’টি নয় গোটা পরিবারের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব থাকে। যে দায়িত্বের কথা চিন্তা করে এরা ভুলে যায় নিজের স্বপ্নকে। দেশে রেখে আসা পরিবারের সদস্যদের স্বপন পূরণকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে স্থীর করে এরা প্রতিনিয়ত সহ্য করে যায় অসহনীয় কষ্ট।
একজন প্রবাসীর উপর ভরসা করে গোটা একটা পরিবার স্বপ্নের পশরা সাজায়। অথচ প্রবাসে এসে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকে শামিল হচ্ছেন মৃ’ত্যু’র কাতারে ।

আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে প্রবাসীদের মৃ’ত্যু’র মিছিল লম্বা হয়ে আসছে । নিজ জন্মভুমি ছেড়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে সহায় সম্বল বিক্রি করে পরবাসে ঠাঁই নেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা খ্যাত প্রবাসীরা। দেশের মায়া ত্যাগ করে হাজার মাইল দূরে শ্রম বিক্রি করা এই স্বপ্নবাজ প্রবাসীরা স্বপ্ন পূরণের আশায় কাজ করে বছরের পর বছর রেমিট্যান্স পাঠিয়ে পরিবার এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন।

সকলেরই লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার। অথচ শ্রম বিক্রিতে ব্যস্ত প্রবাসীদের কর্মক্ষমতার পাশাপাশি কমতে থাকে আয়ুষ্কাল। তাই, হৃদরোগ-স্ট্রোক, সড়ক দু’র্ঘ’ট’না, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, হ’ত্যা’স’হ প্রতিবছরেই মৃ’ত্যু’র মিছিলে যোগ হয় হাজারও প্রবাসীর নাম।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব শ্রমিকের মৃ’ত্যু’র কারণ হৃদরোগ। এদের অধিকাংশেরই বয়স ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে। অভিবাসন ব্যয়ের তুলনায় কম আয়ের কারণে মানসিক চাপ ও দীর্ঘদিন স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একাকিত্বই প্রবাসী শ্রমিকদের হৃদরোগের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি দৈনিক ১২-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম, অপর্যাপ্ত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকার কারণেও রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।

এমন-ই একজন কুমিল্লা চান্দিনার কোরবানপুর গ্রামের আব্দুল মজিদের পুত্র মাসুদ । গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকালে রিয়াদের মোবারক হাসপাতালে মৃ’ত্যু’ব’র’ন করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) । আজিজিয়া সবজি মার্কেটে একটি মুদি দোকানে কর্মরত ছিলেন । তিনি দুই ছেলে সন্তানের জনক । তার মৃ’ত’দে’হ সেই হাসপাতালের হি’ম’ঘ’রে রয়েছে ।

আরেকজন, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের, পাঁচকিত্তা গ্ৰামের আঃ হক মেম্বার বাড়ীর হাজি মোঃ চারু মিয়ার ছেলে মোস্তফা কামাল । ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে সৌদি আরবের আল-খারিজে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান । সেখানে তাসিদ আল বীনা কোম্পানীতে কর্মরত ছিলেন মোস্তফা । তিনি দুই মেয়ে এবং এক ছেলের জনক । তার মৃতদেহ স্হানীয় একটি হাসপাতালের হিমঘরে রাখা আছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মোট ৩ হাজার ৭৯৩ বাংলাদেশি কর্মীর ম’র’দে’হ দেশে আনা হয়েছে। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩৮৭। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ৩ হাজার ৪৮১, ২০১৫ সালে ৩ হাজার ৩০৭ ও ২০১৪ সালে ৩ হাজার ৩৩৫ জন বৈধ কর্মীর ম’র’দে’হ দেশে এসেছিল। অধিকাংশের ক্ষেত্রেই মৃ’ত্যু’র কারণ হিসেবে বলা হয়েছে স্ট্রোক ও হৃ’দ’রো’গ।

২০১৮ সালে ৩ হাজার ৬৭৬ জন বৈধ কর্মীর পাশাপাশি অবৈধভাবে কর্মরত ১১৭ জনের মরদেহও দেশে এসেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৫৩টি ম’র’দে’হ এসেছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এ ছাড়া ৩৭৪টি ম’র’দে’হ এসেছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ৬৬টি সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

বেশির ভাগ মরদেহই এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সৌদি আরব থেকে। আরবের পর বেশি ম’র’দে’হ এসেছে মালয়েশিয়া থেকে। বিজলী বাতির আলো দেখে যে প্রবাসীদের ভোর হয়, তাদের চোখে রাতও নামে বিজলী বাতির আলোতে। মাঝখানে সূর্য্যের আলো শুধুই কর্মব্যস্ততা। ৮ থেকে ১২ কিংবা ১৮ ঘণ্টা কর্মস্থলে ব্যয় করে যখন তারা ঘরে ফেরেন তখনই শুরু হয় নানামুখী চিন্তা। কখনো পারিবারিক, কখনো ভিসার মেয়াদ উর্ত্তীণ হয়ে যাবার চাপ, ভিসা পরিবর্তনের খরচ জোগাতে হিমশম খাওয়া, কখনো বা কোম্পানি বন্ধ হয়ে দেশে ফেরার ভয়, ভালো কর্মসংস্থান না পাওয়া, মাস শেষে ঠিক মত বেতন না পাওয়া। নিদ্রাহীন এসব প্রবাসীদের পেয়ে বসে হৃদরোগ। নিয়তির বিধানে কারো কারো জীবন অবসান ঘটে যায় নিষ্ঠুর প্রবাসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যয়ের তুলনায় কম আয়ের কারণে মানসিক চাপ ও দীর্ঘদিন স্বজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে একাকিত্বই প্রবাসী কর্মীদের স্ট্রোক ও হৃদরোগের প্রধান কারণ। তাছাড়া দৈনিক ১২-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম, অপর্যাপ্ত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকার কারণেও প্রবাসে এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলছেন, ‘হৃদরোগ ও ‘মৃ’ত্যু’ ঝুঁকি কমাতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দেয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা, ব্লাড প্রেসার ও ডায়বেটিস চেক করাসহ প্রবাসীদের সচেতন করতে কমিউনিটি সংগঠনগুলোর উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। তবে সি’গা’রে’ট সেবনের প্রবণতাও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় ।