‘ও মাগো তুমি মাটির কবরে কেমনে থাকবা’

121

রাজধানীতে বাসচাপায় নি’হ’ত নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদিয়া সুলতানার মা পারভিন আক্তার মেয়েকে হারিয়ে আহাজারি থামাতে পারছেন না। বারবার বলছেন, ‘ও মা, মাটির কবরে কিভাবে থাকবা। গতকালও আমার কাছে ফোনে বলল,

মা আমার আজ ক্লাস নাই, বই কিনতে বের হব। এ কেমন বই কিনতে গেলা মা।’ নাদিয়ারা তিন বোন। তিনজনের বড় নাদিয়া। তার স্বপ্ন ছিল বড় ফার্মাসিস্ট হওয়া। আর এ স্বপ্ন শুধু নাদিয়ার একার নয়, ছিল পুরো পরিবারের; কিন্তু সেই স্বপ্ন পি’ষ্ট হলো সড়কে।

নাদিয়ার দা’ফ’নের সাথে সাথে পুরো পরিবারের স্বপ্নও দা’ফ’ন হয়ে গেলো, যা আর কোনো দিনই মাথা তুলে দাঁড়াবে না। এর আগে, গত রোববার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় ভিক্টর ক্ল্যাসিক পরিবহণের

একটি যাত্রীবাহী বাসের ধা’ক্কা’য় নি’হ’ত হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাদিয়া আক্তার। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে। প্রায় ২০ বছর ধরে তার পরিবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় বসবাস করেন।

ঢাকা থেকে সোমবার সকালে রাঙ্গাবালী সদর ইউনিয়নের পূর্বনেতা গ্রামের নিজ বাড়ি পৌঁছায় নাদিয়ার মৃ’ত’দেহ। সকাল সাড়ে ১০টায় ওই গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দা’ফ’ন সম্পন্ন হয়। তার মৃ”ত্যু’শোকে বিহ্বল পুরো পরিবার,

সঙ্গে বুক ভারি হয়ে এসেছে পাড়া-প্রতিবেশীদেরও। নাদিয়ার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, মা পারভীন আক্তারের আহাজারি যেন থামছেই না। ক্ষণে ক্ষণে মেয়ের কবরের দিকে ছুটে যান তিনি। কিছুক্ষণ পরপরই হয়ে পড়েন অজ্ঞান।

বিলাপ আর আহাজারিতে বলছেন- ‘ও মাগো তুমি মাটির কবরে কেমনে থাকবা, আমাগোরে ছাড়া গতকালও আমার কাছে ফোনে বললো মা আমার আজ ক্লাস নাই, বই কিনতে যাব। এ কেমন বই কিনতে গেলা মা। মেয়ের শোকে যেন

পাথর হয়ে গেছেন বাবা জাহাঙ্গীর মৃধাও। বাড়ি উঠোনে চেয়ারে বসে কখনো চোখের পানি মুছছেন, আবার কখনো মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকছেন। বুকভরা কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, তিন মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিল নাদিয়া।

আমার কোনো ছেলে নাই। মেয়েরাই আমার সব। আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ তো চিরকাল বাঁচে না। ভাবছিলাম মেয়েটা স্ট্যাবলিস্ট (প্রতিষ্ঠিত) হবে। ছোট দুই বোনের দেখাশুনা ও (নাদিয়া) করবে- এমন আশা ছিল আমাদের; কিন্তু আমার সব স্বপ্ন শেষ।

চোখের কোণে জমে থাকা ছলছল লোনা জলে নাতনির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাদা ধলু মৃধা বলেন, অত্যন্ত ভালো মেয়ে ছিল। কলেজে পড়তো ঠিকি মাথায় হিজাব পরে ক্লাস করত। সবার সঙ্গে ভালো আচরণ করত।

আমি মাঝে-মধ্যে ঢাকা গেলে আমাকে গ্রামে আসতে দিতে চাইত না। বলত দাদা তুমি এখানেই থেকে যাও। গ্রামের বাড়িতে দাদি বুড়ো মানুষ তোমার ঠিকমতো খেয়াল রাখতে পারে না। আবার গ্রামে এলে প্রায়ই ফোন করে বলত

দাদা তুমি ঢাকায় চলে এসো। আমাদের সঙ্গে থাকো দাদাভাই, ঢাকায় সবাই আছে শুধু তুমিই নাই। নি’হ’ত নাদিয়ার পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, নাদিয়ার ফার্মাসিস্ট হওয়ার স্বপ্ন পূরণের যাত্রা মাত্রই শুরু হয়েছিল। দুই সপ্তাহ আগে

রাজধানীর নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। ক্লাস করতে এক সপ্তাহ আগে নারায়ণগঞ্জের বাসা ছেড়ে উত্তরার একটি মেসে উঠেন। কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘ’ট’নায় তার সেই স্বপ্নযাত্রার ইতি ঘটল।