ভারতে মুসলিমদের যে মসজিদ দেখাশোনা করে হিন্দুরা !

341

ভারতের ‌বিহারের নালন্দার ছোট্ট এক গ্রাম মারি’তে ঐতিহাসিক বিশাল এক মসজিদের অবস্হান। যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম। তাই মসজিদের খেদমতে সব সময় মুসলিমরা সময় দিতে পারেন না।

যার ফলে অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয় মসজিদটির। তাই মুসলিমদের অনুপস্থিতিতে মসজিদের দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করে স্থানীয় হিন্দুরা।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, মারি গ্রামে আগে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি থাকলেও নানা কারণে দিনদিন মুসলিমদের সংখ্যা কমে গেছে। মসজিদের খেদমতে সব সময় স্থানীয় মুসলমানরা সময় দিতে পারেন না।

তা ছাড়া এতো কম সংখ্যক জনবল নিয়ে এতো বড় মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল তাদের কাছে। যার ফলে অযত্ন অবহেলায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম মসজিদটি। তাই মুসলিমদের অনুপস্থিতিতে মসজিদের দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে স্থানীয় হিন্দুরা।

এএনআই আরও জানায়, মাঝেমধ্যে ওয়াক্ত হলে আজান দেয়ার মতো মুয়াজ্জিন খুঁজে পায়না স্থানীয়রা। সে বিষয়টি সুরাহা করতে স্থানীয় হিন্দুরাই আজানের সময় হলে পেনড্রাইভে সেভ করা আজান মাইকে বাজিয়ে থাকেন।

বিহারের সেই গ্রামটির ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন নজির ভারতবাসীকে অবাক করেছে। খবর প্রকাশের পর সেই গ্রাম দেখতে ছুটেছেন অনেকেই।

যে ঘটনা বদলে দিয়েছিল ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর জীবন

ম’রুভূমির মাঝ দিয়ে মালপত্র আর যাত্রীসমেত উটের কাফেলা চলেছে জুরজান হতে তূসের পানে। হঠাৎ হা..রে..রে..রে করে কাফেলায় আ’ক্র’ম’ণ চালালো ম’রুচারী দুর্ধ’র্ষ ডা’কাতদল।

চোখের নিমিষে যাত্রীদের সর্বস্বান্ত করে দিয়ে তাদের মালপত্রসহ ভারবাহী পশুগুলো লু’ন্ঠ’ন করে নিয়ে গেল ডা’কাতেরা। এসময় হতাশ হয়ে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে যেতে দেখা যাত্রীদের মধ্য থেকে এক অল্পবয়সী কিশোর ছুটে গেল কাফেলা লুন্ঠন করে চলে যেতে থাকা ডা’কা’তদলের দিকে।

পেছন ফিরে ডা’কা’তসর্দার সেই ছেলেটিকে দৌড়ে আসতে দেখে হাতের অ’স্ত্র উঁচিয়ে বললো, ‘দাঁড়াও! আর এক কদম সামনে এগোলে জানে মে’রে ফেলবো!’ ছেলেটি সে জায়গাতেই দাঁড়িয়ে বললো, ‘আল্লাহর দোহাই লাগে! আমা’র তালীকাতগুলো ফেরত দিন।’ ডা’কাতসর্দার জিজ্ঞাসা করলো, ‘এটা কি জিনিস?’

সে বললো, ‘ওগুলো আমা’র থলেতেই আছে। আমা’র বই সেগুলো, আমা’র শিক্ষকদের কাছ থেকে লেকচার শুনে শুনে লিখে রাখা নোট। আমি দুই বছর ধরে শুধু এই কারণেই বিদেশ-বিভুঁইয়ে ক’ষ্ট স্বীকার করে থেকেছি।’

ডা’কাতসর্দার এ কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠলো। সে বিদ্রুপ করে বললো, ‘আরে! তুমিতো দেখি বিশাল বিদ্যার জাহাজ! এগুলো তোমা’র বিদ্যা? এ কোনধরণের বিদ্যা যেটা আমা’র মতো একজন নগণ্য-নিকৃষ্ট ব্যক্তি চাইলেই চু’রি করে নিয়ে যেতে পারে? তার মানে এগুলো না থাকলে তোমা’র বিদ্যার ভাঁড় শূন্য? এই সামান্য কাগজগুলোর মধ্যেই যদি তোমা’র বিদ্যা সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে তোমা’র আর একজন মূর্খের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? যাও যাও! নিয়ে যাও তোমা’র বিদ্যার থলে।’

দস্যু সর্দারের কথায় ছেলেটি যারপরনাই লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলো। সে বাড়ি ফিরে নোটসমূহ মুখস্থ করতে বসে যায়। দীর্ঘ তিন বছর একাদিক্রমে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে ওইগুলো সম্পূর্ণরূপে ঠোঁটস্থ-মুখস্থ-কন্ঠস্থ করে ফেলে।

এরপরে তার জ্ঞানের পিপাসা আরো বেড়ে যায়। জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে সে আবার গৃহ ত্যাগ করে। একসময় তার জ্ঞানের পরিধি এতো বিস্তৃতি লাভ করে যে আজ পর্যন্ত লোকে তাকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্ম’রণ করে থাকে। জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটির নাম ই’মাম গাজ্জালী (রহ.)।

তৎকালীন খোরাসান প্রদেশের তূস জে’লার তাহেরান শহরে হিজরী ৪৫০ সন মোতাবেক ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া এই ক্ষণজন্মা মহান দার্শনিক আলেমের প্রকৃত নাম ছিল মুহম্ম’দ। তবে তিনি হুজ্জাতুল ইস’লাম উপাধি এবং ই’মাম গাজ্জালী নামেই সকলের নিকট সুপরিচিত। ‘গাজ্জাল’ শব্দের অর্থ সুতা বিক্রেতা। তাই তার পারিবারিক উপাধি ছিল ‘গাজ্জালী’।

ই’মাম গাজ্জারির পিতা বিশেষ কোনো কারণবশত: শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত ছিলেন। এই জন্য তিনি সারাজীবন অনুতাপও করেছেন। মৃ’ত্যু’কা’ল ঘনিয়ে আসলে তিনি তার কোনো এক সুফী বন্ধুর হাতে ই’মাম গাজ্জালী ও তার ছোট ভাইকে (তিনিও আরেক বিখ্যাত সুফী আহম’দ গাজ্জালী) তুলে দিয়ে বললেন, ‘বন্ধু!

আমি জীবনে লেখাপড়া শিখতে পারিনি। তাই আমা’র একান্ত ইচ্ছা আমা’র ছেলে দুইটি যেন লেখাপড়া শিখে আমা’র সেই অ’প’রাধের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত করে। তুমি তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেবে।’

পিতার মৃ’ত্যু’র পর ই’মাম গাজ্জালী ও তার ছোট ভাই তাদের পিতৃবন্ধু সেই বুযর্গের তত্ত্বাবধানে থেকে লেখাপড়া শিখতে থাকেন। প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর তিনি তাদের তাহেরান শহরেরই একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। ই’মাম গাজ্জালী সেখানে আহম’দ ইবনে মুহম্ম’দ রাজকানীর নিকট ফেকাহ শাস্ত্রের প্রাথমিক কিতাবসমূহ সমাপ্ত করেন।

তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য জুরজান শহরে যান এবং সেখানে আবু নসর ইসমাঈলীর নিকট শিক্ষা আরম্ভ করেন। তৎকালিন শিক্ষালাভের নিয়ম ছিল- শিক্ষক যে বিষয়ে শিক্ষা দিতেন ছাত্ররা সেটি সাথে সাথে লিখে নিতো। এজাতীয় নোট’কে তালীকাত বলা হতো। এই তালীকাত নিয়ে ফেরার পথেই তরুণ ই’মাম গাজ্জালী দ’স্যু’দ’লে’র খপ্পরে পড়েন।

ই’মাম গাজ্জালী পরবর্তীতে বলেছিলেন, ‘আমা’র সেসময় মনে হয়েছিল স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন সেই ডা’কা’তসর্দারের মুখ দিয়ে আমাকে উপদেশ দেয়াচ্ছেন যে, আমি আসলেই এখনো গ্রন্থগত জ্ঞানকে আত্মস্থ করতে পারিনি।’

ওই একটি ঘটনা ই’মাম গাজ্জালীর জীবনকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছিল। তিনি সেই তালীকাতগুলো মুখস্থ করেই থেকে থাকেননি। তার যুগের যতো ধ’র্মীয়, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ছিল সবকিছুই তিনি তার অসাধারণ মেধার বলে আত্মস্থ করেন। এসকল বিষয়ে প্রথাগত বিদ্যার যাবতীয় পাঠ যখন সমাপ্ত করেন তখন তার বয়স মাত্র ২৭ বছর। এই বয়সেই ভাষাবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যার ওপরে তার এতোটাই দখল তৈরি হয় যে তিনি এককথায় অ’প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।

তার বক্তব্যের মাধুর্য ও প্রাঞ্জলতা লোকজনকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থেকে তার কথা শুনতে বাধ্য করতো। অথচ শুধুমাত্র এক ডা’কাতসর্দারের সহাস্য বিদ্রুপই তাকে তূস জে’লার এক পিতৃহীন কিশোর থেকে পরবর্তীতে হুজ্জাতুল ইস’লাম ই’মাম গাজ্জালী (রহ.) হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল।

তাই আজ, এই হাজার বছর পরেও ই’মাম গাজ্জালী (রহ.) তার চিন্তা ও কাজের দরুণ মানুষের কাছে চিরস্ম’রণীয় হয়ে আছেন।