যেসব রোগ সারাতে কালোজিরা ভীষণ উপকারী

193

কালোজিরার অশেষ গুণ – ভীষণ উপকারী জিনিস কালোজিরা। এটাকে খাবার না বলে পথ্য বলাই ভালো। কালোজিরার অশেষ গুণ, যে সকল সমস্যায় কালোজিরা বিশেষ ভাবে কার্যকর-

কালোজিরাঃ কালোজিরা বা নাইজেলা সিডে ১৫টি অ্যামোইনো এসিড আছে। এছাড়াও কালোজিরায় ২১শতাংশ প্রোটিন রয়েছে ও ৩৮শতাংশ শর্করা আছে। নিয়মিত কালোজিরা সেবনে স্পার্ম সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং স্পার্মের গুনাগুণ বাড়ে।

কালোজিরার বৈশিষ্ট এবং এর স্বাস্থগত গুন গুলোঃ এখন প্রচণ্ড গরম। এই মৌসুমে গরম ও ঠান্ডাজনিত কারণে অনেকের জ্বর হচ্ছে। জ্বর, কফ, গায়ের ব্যথা দূর করার জন্য কালোজিরা যথেষ্ট উপকারী বন্ধু। এতে রয়েছে ক্ষুধা বাড়ানোর উপাদান। পেটের যাবতীয় রোগ-জীবাণু ও গ্যাস দূর করে ক্ষুধা বাড়ায়। যাঁরা মোটা হতে চান, তাঁদের জন্য কালোজিরা যথাযোগ্য পথ্য।

আবার যাঁদের শরীরে পানি জমে হাত-পা ফুলে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে, তাঁদের পানি জমতে বাঁধা দেয়। কালোজিরা শরীরের জন্য খুব জরুরি। সন্তান প্রসবের পর কাঁচা কালোজিরা পিষে খেলে শিশু দুধ খেতে পাবে বেশি পরিমাণে।

কালোজিরায় রয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোরিয়াল এজেন্ট, অর্থাৎ শরীরের রোগ-জীবাণু ধ্বংসকারী উপাদান। এই উপাদানের জন্য শরীরে সহজে ঘা, ফোড়া, সংক্রামক রোগ (ছোঁয়াচে রোগ) হয় না। আমাদের মেধার বিকাশের জন্য কাজ করে দ্বিগুণ হারে। কালোজিরা ১টি অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিসেপটিক।

দাঁতে ব্যথা হলে কুসুম গরম পানিতে কালোজিরা দিয়ে কুলি করলে ব্যথা কমে; জিহ্বা, তালু, দাঁতের মাড়ির জীবাণু মরে। খুব বেশি কালোজিরা খেলে হিতে বিপরীত হয়। আর যাঁরা কালোজিরা হজম করতে পারেন না, তাঁরা খাবেন না।

কালোজিরা কৃমি দূর করার জন্য কাজ করে। তারুণ্য ধরে রাখে দীর্ঘকাল। আমাদের কাজ করার শক্তিকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেহের কাটা-ছেঁড়া শুকানোর জন্যও কাজ করে। তাই প্রতিদিন অল্প করে ভাত বা রুটির সঙ্গে খেতে পারেন কালোজিরা।

কালোজিরার মাহাত্মঃ কালোজিরার আমাদের অতি পরিচিত ১টি মসল্লা।
হুজুর পাক(সাঃ) বলেছেন, “একমাত্র মৃত্যু ছাড়া সকল রোগের ঔষুধ এই কালোজিরা’ – আল হাদিস

প্রায় ২ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষ খাবারের সঙ্গে ‘কালোজিরা’ গ্রহণ করে আসছে।সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানতে পেরেছেন যে কালোজিরার সব গুণ লুকিয়ে আছে এর তেলে। সাধারণত আমরা খাবারের সঙ্গে মসলা হিসেবে অথবা ভর্তা করে ভাতের সঙ্গে কালোজিরা খেয়ে থাকি। কিন্তু এভাবে আমাদের স্বাস্থ্য কালোজিরার আসল গুণাবলি থেকে বঞ্চিত হয়। তাই কালোজিরা নয়, বরং কালোজিরার তেল আমাদের শরীরের জন্য নানাভাবে উপকারী। কালোজিরার তেলে ১০০টিরও বেশি উপযোগী উপাদান আছে। এতে আছে প্রায় ২১শতাংশ আমিষ, ৩৮শতাংশ শর্করা এবং ৩৫শতাংশ ভেষজ তেল ও চর্বি।

কালোজিরায় অন্যতম উপাদানের মধ্যে আছে নাইজেলোন, থাইমোকিনোন ও স্থায়ী তেল। এতে আরও আছে আমিষ, শর্করা ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিডসহ নানা উপাদান। পাশাপাশি কালোজিরার তেলে আছে লিনোলিক এসিড, অলিক এসিড, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি২, নিয়াসিন ও ভিটামিন-সি।

কালোজিরার বৈজ্ঞানিক নাম নাইজেলা সাতিভা। নাইজেলা সাতিভাকে আরবি ভাষায় বলা হয় হাব্বাত-উল-বারাকা (রহমত পুষ্ট বীজ) এবং ইংরেজিতে বলা হয় লাভ ইন দ্য মিস্ট। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করায় কালোজিরার অবদান অসামান্য এবং সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল জীবনে এর প্রভাব পড়ে নানাভাবে। এটি দেহকে এর নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মে সুস্থ করে তোলায় সহযোগিতা করে। এই অতুলনীয় ভেষজের গুণাগুণ প্রায় কিংবদন্তির মতো এবং সম্প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোয় চিকিৎসায় এর গুরুত্ব আস্তে আস্তে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।

প্রায় ৩ হাজার বছর ধরে চলে আসা গল্প গাঁথায় যে কালোজিরার মহৌষধি গুণের কথা বলা হয়েছে, ৫০বছরে সেই ভাষ্য অর্জন করেছে বৈজ্ঞানিক ভাবে সম্মতি ও সম্মান। শরীরের রোগ প্রতিরোধে কালোজিরার মতো এত সহজে এত কার্যকর আর কোনো প্রাকৃতিক উপাদান আছে বলে জানা যায়নি।

উন্নত দেশগুলোয় বিভিন্ন কারণ, যেমন চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে মাটি তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি হারায়, তাই শস্যের গুণাগুণ ধ্বংস হয়ে যায়, আর মানুষ শিকার হয় সেলুলার ম্যালনিউট্রেশনের। রান্নার পদ্ধতির কারণে খাবারের খাদ্যগুণ অনেকাংশেই নষ্ট হয়।পাশাপাশি আছে পরিশোধিত খাবার গ্রহণ ও দূষিত পরিবেশের প্রভাব। এসব কারণের মিলিত ফলাফল খাবারে কালোজিরা তে প্রায় শতাধিক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এর প্রধান উপাদানের মধ্যে প্রোটিন ২১ শতাংশ, শর্করা ৩৮ শতাংশ, স্নেহ ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়াও রয়েছে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ।

প্রতি ১০০ গ্রাম কালোজিরায় যেসব পুষ্টি উপাদান রয়েছে তা নিন্মরূপ-

* প্রোটিন ২০৮ মাইক্রোগ্রাম,

* ভিটামিন-বি ১.১৫ মাইক্রোগ্রাম

* নিয়াসিন ৫৭ মাইক্রোগ্রাম

* ক্যালসিয়াম ১.৮৫ মাইক্রোগ্রাম

* আয়রণ ১০৫ মাইক্রোগ্রাম

* ফসফরাস ৫.২৬ মিলিগ্রাম

* কপার ১৮ মাইক্রোগ্রাম

* জিংক ৬০ মাইক্রোগ্রাম

* ফোলাসিন ৬১০ আইউ

প্রতিদিন সকালে ১চিমটি কালোজিরা ১গ্লাস পানির সাথে খেলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ভেষজবিদরা কালোজিরা কে বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে অভিহিত করেছেন হাঁপানি রোগীদের শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যায় দীর্ঘদিন কালোজিরা সেবনে উপকার পাওয়া যায়। কালোজিরা হরমোন সমৃদ্ধ হওয়ায় পুরুষত্বহীনতায় বা নারী-পুরুষের যৌ’ন অক্ষমতায় নিয়মিত কালোজিরা সেবনে যৌ’ন’শ’ক্তি বৃদ্ধি পায়।

কালোজিরায় রয়েছে ১৫টি অ্যামাইনো এসিড। আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজন ৯টি অ্যাসেনসিয়াল অ্যামাইনো এসিড যা দেহে তৈরি হয় না, অবশ্যই খাবারের মাধ্যমে এর অভাব পূরণ করতে হয়। আর কালোজিরায় রয়েছে ৮টি অ্যাসেনসিয়াল অ্যামাইনো এসিড। সর্দি-কাশি সারাতে এবং দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কালোজিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসূতি মাতাদের দুগ্ধ বাড়াতে ও নারী দেহের মাসিক নিয়মিত করণে এবং মাসিকের ব্যথা নিবারণে কালোজিরার ভূমিকা রয়েছে।
কালোজিরা আরক+কমলার রস যে সকল সমস্যায় কালোজিরা বিশেষভাবে কার্যকর
ব্যবহারঃ

কালোজিরা + পুদিনা

চায়ের সাথে কালোজিরা

কালোজিরা + রসুন + পেঁয়াজ

কালোজিরা + গাজর

কালিজিরার গুনাগুন

মাথাব্যথাঃ
মাথাব্যথায় ভুগছেন? কোনো চিন্তা নেই। কপালের দু’পাশ এবং কানের পাশে দিনে ৩-৪বার কালিজিরার তেল মালিশ করুন। মাথা ব্যথায় কপালে উভয় চিবুকে ও কানের পার্শ্ববর্তি স্থানে দৈনিক ৩/৪ বার কালোজিরা তেল মালিশ করুন।

৩দিন খালি পেটে চা চামচে ১ চামচ করে তেল পান করুন। পাশাপাশি লক্ষণ সাদৃশ্যে হোমিওপ্যাথি ওষুধ নির্বাচন করুন।

সচরাচর মাথাব্যথায় মালিশের জন্য রসুনের তেল, তিলের তেল ও কালোজিরা তেলের সংমিশ্রণ মাথায় ব্যবহার করুন।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা কালোজিরাকে ১টি অব্যর্থ রোগ নিরাময়ের উপকরণ হিসাবে বিশ্বাস করে। এর সাথে ১টি হাদিস জড়িত আছে। হাদিসটি হলো— আয়েশা (রা) ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “এ কালোজিরা সাম ব্যতীত সমস্ত রোগের নিরাময়। আমি বললাম: সাম কি? তিনি বললেন: মৃত্যু!” [বুখারী: ৫৬৮৭]

কালোজিরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে, বহুমুত্র রোগীদের রক্তের শর্করার মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং নিম্ন রক্তচাপকে বৃদ্ধি করে ও উচ্চ রক্তচাপকে হ্রাস করে। এছাড়া মস্তিস্কের রক্ত সঞ্চলন বৃদ্ধির মাধ্যমে স্মরণ শক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

আয়ুর্বেদ এবং ইউনানি মতে কালোজিরা নানাবিধ রোগ-নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। ইউনানি মতে- নারীর ঋতুস্রাবজনীত সমস্যায় কালোজিরা বাটা খাওয়ার বিধান আছে। এছাড়া প্রসূতির স্তনে দুগ্ধ বৃদ্ধির জন্য, প্রসবোত্তর কালে কালিজিরা বাটা খাওয়ার বিধান আছে। তবে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কালিজিরা খেলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া প্রস্রাব বৃদ্ধির জন্য কালোজিরা খাওয়া হয়। তিলের তেলের সাথে কালোজিরা বাঁটা বা কালোজিরার তেল মিশিয়ে ফোড়াতে লাগলে, ফোড়ার উপশম হয়। মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত আছে যে, কালোজিরা যৌন ক্ষমতা বাড়ায় এবং পুরুষত্বহীনতা থেকে মুক্তি দিতে সহায়তা করে।

এছাড়া অরুচি, উদরাময়, শরীর ব্যথা, গলা ও দাঁতের ব্যথা, মাইগ্রেন, চুলপড়া, সর্দি, কাশি, হাঁপানি নিরাময়ে কালোজিরা সহায়তা করে। ক্যান্সার প্রতিরোধক হিসাবে কালোজিরা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কালোজিরা মশলা হিসাবে ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি ৫ ফোঁড়নের ১টি উপাদান। এর বীজ থেকে পাওয়া তেল পাওয়া যায়। তবে পুরানো কালিজিরা তেল স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতি।

কালোজিরার অশেষ গুণঃ
হজমের সমস্যায় ভুগছেন? তাহলে ১/২ চা-চামচ কালোজিরা বেটে পানির সঙ্গে খেতে থাকুন। এভাবে প্রতিদিন ২-৩বার খেলে ১ মাসের মধ্যে হজমশক্তি বেড়ে যাবে। পাশাপাশি পেট ফাঁপা দূর হবে।

১ চা-চামচ কালোজিরার সঙ্গে ৩ চা-চামচ মধু ও ২ চা-চামচ তুলসী পাতার রস মিশিয়ে খেলে জ্বর, ব্যথা, সর্দি-কাশি দূর হয়। সর্দি বসে গেলে কালিজিরা বেটে কপালে প্রলেপ দিন। একই সঙ্গে পাতলা পরিষ্কার কাপড়ে কালোজিরা বেঁধে শুকতে থাকুন, শ্লেষ্মা তরল হয়ে ঝরে পড়বে। আরো দ্রুত ফল পেতে বুকে ও পিঠে কালোজিরার তেল মালিশ করুন।

যেসব মায়েদের বুকে পর্যাপ্ত দুধ নেই, তাদের মহৌষধ কালোজিরা। মায়েরা প্রতি রাতে শোয়ার আগে ৫-১০ গ্রাম কালোজিরা মিহি করে দুধের সঙ্গে খেতে থাকুন। মাত্র ১০-১৫ দিনে দুধের প্রবাহ বেড়ে যাবে। এছাড়া এ সমস্যা সমাধানে কালোজিরা ভর্তা করে ভাতের সঙ্গে খেতে পারেন।

ডায়াবেটিকদের রোগ উপশমে বেশ কাজে লাগে কালোজিরা। ১ চিমটি পরিমাণ কালোজিরা ১গ্লাস পানির সঙ্গে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেয়ে দেখুন, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

স্মরণ শক্তি বাড়াতে নিয়মিত কালোজিরা খান। এটি মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়। যার দরুন স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে এটি প্রাণশক্তি বাড়ায় ও ক্লান্তি দূর করে। লিভারের সুরক্ষায় ভেষজটি অনন্য। লিভার ক্যান্সারের জন্য দায়ী আফলাটক্সিন নামক বিষ ধ্বংস করে কালোজিরা।

মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায় !
চুল পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন? কালোজিরা খেয়ে যান, চুল পর্যাপ্ত পুষ্টি পাবে। ফলে চুল পড়া বন্ধ হবে। আরো ফল পেতে চুলের গোড়ায় এর তেল মালিশ করতে থাকুন। কালোজিরার তেল উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি দূর করে। এছাড়া হূদরোগ নিরাময়ে এ তেল মহৌষধ হিসেবে বিবেচিত।