ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর মন জয় করবেন যেভাবে…

1771

ইসলামি আলোকে স্ত্রীর মন জয় করবেন যেভাবে- শরীর থেকে ঘাম আর মুখ থেকে হয়তো বেরিয়ে আসে তামাক জাতীয় দ্রব্যের দুর্গন্ধ। স্ত্রী বেচারী হয়তো কিছু বলতে পারে না, কিন্তু প্রতিটি স্ত্রীই চায় তার স্বামী তার কাছে পরিপাটি হয়ে আসুক।

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি নিজেকে আমার স্ত্রীর জন্য সাজাতে পছন্দ করি, ঠিক যেভাবে আমি চাই আমার স্ত্রী আমার জন্য সাজুক।’

১. স্ত্রীর জন্য সাজুন– আপনি যেমন চান আপনার স্ত্রী আপনার জন্য সাজ-সজ্জা গ্রহণ করুক, আপনার স্ত্রীও তো চায় আপনিও তার জন্য একটু সাজুন, একটু পরিপাটি হয়ে তার কাছে যান। আজকাল পুরুষরা বাইরে বেরোবার সময় যথেষ্ট স্মার্টনেস প্রদর্শনের চেষ্টা করলেও নিজ ঘরে পরিপাটি থাকার ব্যাপারটা একেবারেই ভুলে যান।

২. সব কিছু স্ত্রীর উপর চাপিয়ে দিবেন না– পুরুষ মানেই মনে করা হয় রাজা-টাজা টাইপের কিছু। আর নারী যেন তার সেবাদাসী। পুরুষ শুধু আদেশ করবে, নারী তা নির্দ্বিধায় পালন করে যাবে।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা এরকম না। একপাক্ষিক না। এখানে উভয়েরই আছে দায়িত্ব-কর্তব্য, আছে একে অপরের উপর অধিকার।

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা পারস্পরিক সহযোগিতামূলক। রাসুল (সা.) শুধু বসে বসে আদেশ করতেন না। কিছু কাজ নিজেই করে নিতেন। নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করতেন। নিজের জুতা নিজেই তালি লাগাতেন। এছাড়াও ঘরোয়া অন্যান্য কাজ করতেন, যেগুলো অন্যান্য পুরুষেরা করে না। (আহমাদ, আলমুসনাদ : ২৪৯০৩)

৩. বসে বসে স্ত্রীর উপার্জন খাবেন না– স্ত্রী যদি দীনের গন্ডির ভেতর থেকে কোন কাজ করে কিছু উপার্জন করে তাহলে স্বামী যেন এটাকে সুযোগ মনে করে ঘরে বসে বসে না খায়। মিরাস সূত্রে স্ত্রী যদি কোনো সম্পদ পায় তাও যেন না নেয়। স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পুরোটাই স্বামীর উপর। স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় সাংসারিক ব্যাপারগুলোতে আর্থিকভাবে অংশগ্রহণ করে, এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু কোন ক্রমেই জোর করা যাবে না (মুসলিম, আসসাহিহ : ৫১৯৯)

৪. সুযোগ বুঝে আচরণ করুন– মানুষ সবসময় এক মুডে থাকে না। যখন আপনার স্ত্রী হাসিখুশি থাকে তখন তার সাথে হাস্যরস করুন। কিছুটা বাচ্চামো, ন্যাকামো করুন। আর যখন প্রয়োজন তখন গুরুগম্ভীর হোন। সাইয়িদুনা উমর (রা.) বলেন, ‘পুরুষের উচিত স্ত্রীর সাথে বাচ্চামিসূলভ ব্যবহার করা, কিন্তু যখন স্ত্রীদের তার প্রয়োজন হবে তখন সে একজন পুরুষের মতো আচরণ করবে।’

৫. জোর করবেন না– কোনো ব্যাপারে, বিশেষ করে জৈবিক চাহিদার ক্ষেত্রে জোর করবেন না। কথোপকথনের সময় খুব অমায়িক ও ভদ্র থাকার চেষ্টা করুন। এমন শব্দ ব্যবহার করুন যা তার হৃদয়কে বিগলিত করে, তাকে আনন্দ দেয়, তার উপর আপনার যেসকল অধিকার আছে তা সে বুঝতে পারে। যখন সে আপনার সঙ্গতা উপভোগ করবে তখন সে নিজেই আপনার চাহিদা পূরণ করবে।

স্বামীর জন্য ‘নেককার স্ত্রী’ দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ…

রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা নারীদের প্রতি কল্যাণকামী হও। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আমি আমার স্ত্রীদের নিকট উত্তম।

বর্তমানে সমাজে নারীপ্রতি করা হচ্ছে নি’র্ম’ম, নির্দয় নি’র্যা’ত’ন। এমন কোনো নি’র্যা’ত’ন নাই যাই করা হয় না। অথচ পৃথিবীতে একজন পুরুষ মানুষের জন্য সর্বোত্তম সম্পদ হচ্ছে নেককার স্ত্রী।

সুতরাং দাম্পত্য জীবনে এ নারী যদি পুত-পবিত্র সচ্চরিত্রা হয়, তাহলে জীবন স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। সমস্যা সংকুল জীবনেও শান্তির ফল্গুধারা বয়ে যায়। যে শান্তি নারী-পুরুষের বৈবাহিক জীবনের মাধ্যমে শুরু হয়। বিবাহিত জীবনে নেককার স্ত্রীর গুরুত্ব অত্যধিক। তাই ইসলাম স্ত্রীকে দিয়েছে সর্বোত্তম মর্যাদা। বৈবাহিক জীবনে নারী অধিকার সম্পর্কে কুরআন হাদিসের বক্তব্য তুলে ধরা হলো-

নারীর বিয়ে-

ইসলাম পূর্ব যুগে বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াই মহিলাদেরকে পুরুষের মালিকানাধীন মনে করা হতো এবং একজন পুরুষ যত খুশী বিয়ে করতে পারত। ইসলাম নারীদের জন্য বিবাহকে বৈধ এবং আবশ্যক করেছেন। এ বিবাহের মাধ্যমে একজন নারীকে একটি সম্মানজনক আসনে সমাসীন করা হয়।

আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের মধ্যকার পুরুষ আর মহিলাদের মধ্য থেকে তাদের বিয়ে দিয়ে দাও যারা দাম্পত্য ছাড়া জীবন অতিবাহিত করে।’ (সুরা নূর)

নারীর মোহর-

মোহরকে নারীর ইজ্জতের গ্যারান্টি করা হয়েছে। ইসলাম পূর্ব যুগে নারীরা তাদের বিয়ের দেন মোহরের মালিকানা পেত না। ইসলাম নারীর মর্যাদা রক্ষায় মোহরের বিধান প্রবর্তন করে তা স্বামীর উপর ফরজ সাব্যস্থ করেছেন। তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, যদি মোহর রূপে অঢেল সম্পদও দেয়া হয় তা ফেরত নেয়া যাবে না। কেননা মোহর বিবাহের শর্ত হওয়ায় সেগুলো মহিলার মালিকানাধীন হয়ে যায়।

আল্লাহ বলেন, আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশি মনে। তারা যদি খুশি হয়ে তা থেকে (কিছু) অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর। (সুরা নিসা : আয়াত ৪)

স্ত্রী হিসেবে নারী-

মোহর নির্ধারণের মাধ্যমে নারী-পুরুষ পরস্পর ইজাব-কবুল করে একজন পুরুষ একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। স্ত্রী হিসেবে নারীকে এক স্বকীয় মর্যাদায় অধিষ্টিত করেছে ইসলাম। তাই স্বামীকে স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সদাচরণের ভিত্তিতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে জীবন-যাপন কর।’ (সুরা নিসা)

সংসার জীবন সুখের লক্ষ্যে আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের আবরণ স্বরূপ এবং তোমরাও তাদের জন্য আবরণ স্বরূপ।’ (সুরা বাকারা)

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘মহিলাদের পুরুষদের উপর যেরূপ অধিকার আছে তেমনি পুরুষদেরও মহিলাদের উপর অধিকার রয়েছে।’ (সুরা বাক্বারা)

নেককার স্ত্রীকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলা হয়,এখন বদকার কোনো মহিলাকে কি সম্পদ বলা যেতে পারে? কাজেই শ্রেষ্ঠ সম্পদ হতে হলে সেরূপ বৈশিষ্ট্যও তো থাকা চাই।

ঈমানের পর সর্বোচ্চ নিয়ামত হচ্ছে সচ্চরিত্র স্বামীকে মুহব্বতকারিনী, চরিত্রবতী ও সন্তানবতী স্ত্রী সুবহানাল্লাহ। এরূপ মহিয়সী নারীকে হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালাম উনার রাজত্ব অপেক্ষা উত্তম বলা হয়েছে।

আর কুফরীর পর সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট বস্তু হচ্ছে কর্কশভাষীনী ও অসচ্চরিত্রা স্ত্রী। নাঊযুবিল্লাহ! কাজেই প্রত্যেক স্ত্রীরই স্বামীকে মুহব্বত করত সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে, তবেই সে তার স্বামীর জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে স্ত্রী প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনসহ নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।