হালাল সবজি ‘মাশরুম’ পুষ্টির দিক থেকে সবার সেরা

195

মাশরুমের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা – মাশরুমে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান প্রচুর পরিমানে ভিটামিন, মিনারেল, অ্যামাইনো এসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। অত্যন্ত পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন একটি হালাল সবজি।

পুষ্টির দিক বিচার করলে মাশরুম সবার সেরা। আজ আমরা জানবো এই মাশরুমের পুষ্টিগুণ এবং বিভিন্ন উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত।

মাশরুমের পুষ্টিগুণ

আমরা প্রতিদিন যে সব খাবার খাই মাশরুমের পুষ্টিগুণ সেগুলোর চেয়ে তুলনা মূলক ভাবে বেশি হওয়ায় এটি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ সহ শরীরকে সুস্থ রাখতে খুবই সহায়ক।

মাশরুমে মানব দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি এমাইনো এসিডের মধ্যে প্রত্যেকটিই বিদ্যমান। প্রোটিনে ভরপুর মাশরুমে কোন প্রকার ক্ষতিকর চর্বি না থাকায় নিয়মিত মাশরুম খেলে মেদভূড়ি, উচ্চ র’ক্ত’চা’প, হৃদরোগ, ইত্যাদি জটিল রোগে আ’ক্রা’ন্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতি একশ গ্রাম মাশরুমে প্রোটিন ২৫-৩৫ গ্রাম, ভিটামিন ৫৭-৬০ গ্রাম ও ৫-৬ গ্রাম মিনারেল, শর্করা, উপকারী চর্বি ৪-৬ গ্রাম পাওয়া যায়। এতে আঁশের পরিমাণও খুবই সন্তোষজনক ও এর পরিমাণ প্রায় ১০-২৮%। এই পরিমাণটি অন্যান্য খাবারের তুলনায় অনেক বেশী।

শুকনো মাশরুমে ৫৭-৬০% ভিটামিন ও মিনারেল থাকে যা আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুবই কার্যকরী ভুমিকা পালন করে। এটি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, সোডিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকায় মাশরুম দেহকে সুরক্ষিত রাখতেও বিশেষ ভুমিকা রাখে।

মাশরুম খাওয়ার পদ্ধতি-

মাশরুম যে কেবল খেতেই সুস্বাদু তাই নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক উপকারী। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাশরুম রাখা উচিত। তবে আবর্জনায় উৎপন্ন মাশরুম না খেয়ে শুধু চাষ করা মাশরুম খেতে হবে। এটি ভেজে, সুপ করে বা রান্না করে কিংবা সালাদ হিসেবেও খাওয়া যায়।

কাঁচা বা শুকনা মাশরুম ১৫ থেকে ২০ মিনিট ফুটানো গরম পানিতে ভিজিয়ে রেখে ভালো ভাবে ধুয়ে নিয়ে উক্ত পানি ফেলে দিতে হয়। মাশরুম ফ্রাই করে বা সবজির মতো রান্না করেও খাওয়া যায়। এছাড়া তরকারি বা মাছ-মাংশের মধ্যে দিয়ে রান্না করে খাওয়া যায়।

মাশরুমের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর উপকারিতা

১। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি-

প্রাকৃতিকভাবে মাশরুমে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন ও মিনারেল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিদ্যমান থাকায় এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। মাশরুমে মানুষের শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পলিফেনল ও সেলেনিয়াম নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মারাত্মক কিছু রোগ, যেমন- স্ট্রোক, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ এবং ক্যান্সার থেকে শরীরকে রক্ষা করে।

২। কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ-

মাশরুমে কোলেস্টরেল কমানোর অন্যতম উপাদান ইরিটাডেনিন, লোভাষ্টটিন, এনটাডেনিন, কিটিন এবং ভিটামিন বি, সি ও ডি থাকায় নিয়মিত মাশরুম খেলে উচ্চ র’ক্তচাপ কমে যায়। এতে উচ্চমাত্রার আঁশ এবং প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকে। এছাড়া এতে সোডিয়ামের পরিমাণও খুবই কম থাকে যার ফলে এটি র’ক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ সহ হৃদপিণ্ডের অন্যান্য কাজেও সহায়তা করে থাকে।

৩। হজমে সাহায্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণ-

মাশরুমে থাকা প্রচুর ফাইবার বা আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া এটি রক্তের চিনির পরিমাণও নিয়ন্ত্রণ করতে ভুমিকা রাখে। ফলে দেহের ওজন কমাতে বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে এই মাশরুম। এতে থাকা ফাইবার ও এনজাইম হজমেও সহায়তা করে। এটি অন্ত্রে উপকারি ব্যাকটেরিয়ার কাজ বৃদ্ধি এবং কোলন এর পুষ্টি উপাদান শোষণকেও বাড়তে সাহায্য করে। তাই অধিক ফ্যাট সমৃদ্ধ লাল মাংসের না খেয়ে মাশরুম খেয়ে ওজন কমানোর সুযোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ-

প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন এবং মিনারেলে পরিপূর্ণ মাশরুম ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য খুবই উপকার বয়ে আনতে পারে। নিয়মিত মাশরুম খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া মাশরুমে বিদ্যমান এনজাইম ও প্রাকৃতিক ইনসুলিন থাকায় এটি খেলে দেহের অতিরিক্ত চিনি ভেঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভুমিকা রাখে।

৫। অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা দূর-

রক্তে আয়রনের পরিমাণ খুব কমে গেলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং যার ফলে মানসিক অবসাদ, মাথার যন্ত্রণা এবং হজমের সমস্যা দেখা দেয়। মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকায় অ্যানিমিয়ার রোগীদের জন্য এটি আশীর্বাদ স্বরূপ। তাই নিয়মিত মাশরুম খাদ্য তালিকায় রাখলে অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

৬। হাড়ের শক্তি বাড়ায়-

সব্জিতে ভিটামিন ডি না পাওয়া গেলেও মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ডি থাকে যা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের শোষণ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালশিয়াম থাকায় আমাদের হাড়ের শক্তি বাড়াতেও এটি সাহায্য করে। তাই গাঁটের ব্যথা কমানো ও হাড়ের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করতে মাশরুমের তুলনা নেই।

৭। ত্বক সুস্থ রাখা-

মাশরুমে ভিটামিনের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে নিয়াসিন ও রিবোফ্লাবিন থাকায় তা ত্বকের জন্য বেশ উপকারী। তাছাড়া এর মধ্যে প্রায় ৮০-৯০ ভাগ পানি থাকে বলে ত্বককে নরম ও কোমল রাখতে বিশেষ ভুমিকা রাখে।

৮। ক্যান্সার প্রতিরোধ করে-

মাশরুমের ফাইটোকেমিক্যাল টিউমারের বৃদ্ধিতে বাঁধার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রকম ক্যানসার যেমন স্তন এবং প্রস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে মাশরুমের তুলনা নেই।

সম্পূরক খাদ্য হলেও অন্যান্য খাবারের সাথে রান্না করলে এর স্বাদ বহুগুণে বেড়ে যায়। অনেক আগে থেকে ব্যবহার করে আসা মাশরুমের গুনাবলী বলে শেষ করার মতো নয়। তাই আসুন বেশী বেশী করে মাশরুম খাই এবং আমাদের শরীরকে করে তুলি রোগ প্রতিরোধ্য।